
বিশেষ প্রতিবেদকঃ স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ফিরোজ আলম তালুকদারকে ঘিরে দপ্তরজুড়ে চলছে ব্যাপক তোলপাড়। দীর্ঘদিন ধরে দুর্নীতি, ঘুষের লেনদেন, টেন্ডার কারসাজি, নিয়োগ–বদলি তদবির থেকে শুরু করে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ তার বিরুদ্ধে। সম্প্রতি গণমাধ্যমে তার অনিয়ম নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হওয়ার পর পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। অভিযোগ আছে, সেই সংবাদ ঠেকাতে ফিরোজ আলম তালুকদার প্রতিবেদককে ভয়ভীতি দেখিয়েছেন, যার জের ধরে শেরেবাংলা নগর থানায় জিডিও করা হয়েছে (জিডি নং—৭১৪/২৫)।
ফিরোজ আলম তালুকদার দীর্ঘদিন ধরেই এলজিইডির বিতর্কিত কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ২০১৫ সালে তাকে অবৈধ সম্পদ ও কর ফাঁকির অভিযোগে জিজ্ঞাসাবাদ করেছিল। সে সময়ও তার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ উঠেছিল, কিন্তু রাজনৈতিক সুরক্ষার কারণে কোনো ব্যবস্থা হয়নি বলে বিভিন্ন সূত্র দাবি করেছে। এলজিইডির সাবেক প্রধান প্রকৌশলী ওয়াহেদুর রহমানের আমলে পদোন্নতির নামে কোটি কোটি টাকার ঘুষ বাণিজ্যে ফিরোজের বড় ভূমিকা ছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে।
তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী উপ-সহকারী প্রকৌশলী শেখ রাজিবকে ঘিরেও গড়ে ওঠে এক প্রভাব বলয়। রাজিবের স্ত্রী পুলিশের এসআই হওয়ায় এবং গণভবনে দায়িত্বে থাকার কারণে এই প্রভাব আরও শক্ত হয়। অভিযোগ রয়েছে, তিনি গণভবনের নাম ব্যবহার করে দপ্তরে এমন পরিবেশ তৈরি করেছিলেন যেন তার কথাই ‘তথাকথিত ওপরের নির্দেশ’। ফিরোজ–রাজিব জুটির বিরুদ্ধে নানা প্রকল্পে নিম্নমানের কাজ, অতিরিক্ত বিল, কাগজে-কলমে দেখানো কাজ এবং কোটি কোটি টাকার লোপাটের উঠেছে।
সরকার পরিবর্তনের পর দপ্তরে প্রবেশ করলে ক্ষুব্ধ কর্মচারীরা ফিরোজকে লাঞ্ছিতও করেন। সেই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়ে। পরে তিনি গোপনে অফিসে যাতায়াত করতে বাধ্য হন। বর্তমানে তাকে এলজিইডির প্রধান কার্যালয়ে বদলি করা হয়েছে।
তার বিরুদ্ধে বেশ কয়েকটি প্রকল্পে ভয়াবহ অনিয়মের প্রমাণও পাওয়া গেছে। দেবীনগর–হাশেম মাদবর সড়ক প্রকল্পে রাস্তা অর্ধেক কাজ হওয়ার পরও ৩৭ লাখ টাকা অতিরিক্ত বিল উত্তোলনের অভিযোগ আছে। ওই বিল অনুমোদনে হানিফ মোহাম্মদ মুর্শিদী ও উপ-সহকারী প্রকৌশলী শেখ রাজিবের সম্পৃক্ততার কথাও উঠে এসেছে। রাধানগর–কৃষ্ণদেবপুর সড়ক প্রকল্পে ১ কোটি ২২ লাখ টাকার কাজ দেখিয়ে ৮৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা অতিরিক্ত বিল নেওয়া হয়, যদিও মাঠে কাজই হয়নি। একইভাবে বান্দুরা–বারুয়া–শিকারীপাড়া সড়ক প্রকল্পে ৩২ লাখের বেশি অগ্রিম টাকা তোলা হলেও কাজের শুরু পর্যন্ত হয়নি, ফলে চুক্তি বাতিল করতে হয়।
অনুসন্ধানে আরও বেরিয়ে এসেছে, ঢাকার একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতুর নকশা পরিবর্তনের বিনিময়ে ফিরোজ আলম তালুকদার তিন বিঘা জমি নিয়েছেন। একাধিক সূত্র বলছে, তিনি দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী লীগের প্রয়াত নেতা মোহাম্মদ নাসিমের নাতি অথবা ব্যবসায়ী সালমান এফ রহমানের আত্মীয় পরিচয় ব্যবহার করে প্রতিষ্ঠানটিতে নিজের অবস্থান প্রভাবশালী করে রেখেছিলেন। বঙ্গবন্ধু পরিষদের সেক্রেটারি পরিচয়ও কাজে লাগাতেন নিয়মিত।
ক্ষমতার রদবদলের পর এখন তিনি নতুন মোড়কে তদবির বাণিজ্য শুরু করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। বিভিন্ন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার ছড়িয়েও নিজের অবস্থান টিকিয়ে রাখার চেষ্টা চলছে। সত্যতা জানতে চাইলে ফিরোজ আলম তালুকদার প্রতিবেদকের প্রতি উত্তেজিত আচরণ করেন এবং বলেন— “কাজ না করেই বিল দেওয়ার দায় শুধু আমার নয়, থানা ইঞ্জিনিয়ারসহ অন্যদের কাছেও জানতে হবে।”
এলজিইডির ভেতরে-বাইরে সচেতনরা বলছেন, ফিরোজ আলম তালুকদার শুধু একজন প্রকৌশলী নন—তিনি যেন এক অঘোষিত ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু। এসব অভিযোগের সঠিক তদন্ত ও দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই উন্নয়ন প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতা আরও নষ্ট হবে—এমন মন্তব্য করেছেন অনেকেই।
