
বিশেষ প্রতিবেদকঃ গণপূর্ত অধিদপ্তরের উপসহকারী প্রকৌশলী এ এস এম আবু সায়েম জুয়েল—একসময়ের ক্ষমতাবান একজন সরকারি কর্মকর্তা, যিনি দীর্ঘ সময় ধরে স্বৈরাচার সরকারের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। কিন্তু গত বছরের ৫ আগস্ট আন্দোলনের পর সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গেই তার আচরণে দেখা যায় নাটকীয় পরিবর্তন। যিনি আগে বঙ্গবন্ধু পিডব্লিউডি ডিপ্লোমা প্রকৌশলী পরিষদের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ছিলেন এবং নিয়মিত “জয় বাংলা” লেখা স্ট্যাটাস দিতেন, হঠাৎ করেই নিজেকে আওয়ামীবিরোধী হিসেবে উপস্থাপন করতে শুরু করেন। নিজের অতীত ঢাকতে যেন নতুন মুখোশ পরে মাঠে নামলেন তিনি।
ছাত্রজীবনে ছিলেন কুখ্যাত ছাত্রলীগ ক্যাডার। ২০০৬ সালে চাকরিতে যোগ দেওয়ার পর থেকেই ঢাকা শহরের বিভিন্ন ডিভিশনে ঘুরে ঘুরে তৈরি করেন নিজের এক প্রভাবশালী নেটওয়ার্ক। ঠিকাদার থেকে শুরু করে অফিসের করিডর—সবখানেই তার নাম উচ্চারিত হতো ভয় আর বিতর্কের সঙ্গে। অভিযোগ রয়েছে, গত ২০ বছরে নাম-বেনামে প্রায় ২০ কোটি টাকার সম্পদ গড়েছেন তিনি—বাড়ি, প্লট, গাড়ি, অ্যাপার্টমেন্ট—সবই ক্ষমতার আড়ালে করা অনিয়মের ফল বলে সহকর্মীদের দাবি।
তোফায়েল আহমেদ ও আমির হোসেন আমুর আত্মীয় পরিচয় দেখিয়ে জুয়েল পূর্ত অধিদপ্তরে ছিলেন এক ‘অঘোষিত সম্রাট’। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা থেকে সাধারণ কর্মচারী—যার সঙ্গেই তার বিরোধ হতো, গালি-হুমকি আর হয়রানি ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। কয়েকজন প্রকৌশলী অভিযোগ করেছেন, তাকে প্রতিবাদ করলে তারা শারীরিক নির্যাতনের শিকারও হয়েছেন।
এমনকি বদলিকেও তিনি বানিয়েছিলেন নিজের ক্ষমতা দেখানোর হাতিয়ার। গত ৩ জুলাই প্রধান প্রকৌশলীর আদেশে যখন তাকে রেলওয়ে ডাইভারশন উপবিভাগে বদলি করা হয়, তখনো তিনি ঢাকার বাইরে না গিয়ে রাজধানীতেই থেকে যান। একাধিক সূত্র বলছে, এই বদলির পেছনে ভূমিকা ছিল ছাত্র উপদেষ্টা হাসনাত আব্দুল্লাহর শ্বশুরের। এমনকি একজন জামায়াত নেতা পর্যন্ত তার পক্ষে সুপারিশ করেছেন—যা এখন পুরো অধিদপ্তরে আলোচনার বিষয়।
অন্যদিকে, যিনি আগে বুকে নৌকার ব্যাজ ঝুলিয়ে মন্ত্রণালয়ে ঘুরতেন, বঙ্গবন্ধুর মাজার সফরে নিয়মিত অংশ নিতেন, তিনিই এখন সোশ্যাল মিডিয়ায় হঠাৎ করেই বিরোধী দলের মতাদর্শ ছড়াচ্ছেন। সহকর্মীদের চোখে বিষয়টি মোটেও বিশ্বাসযোগ্য নয়। তাদের মতে, পরিস্থিতি বদলেছে দেখে তিনি শুধু নিজের অতীত পাপ লুকানোর চেষ্টা করছেন।
ঠিকাদারদের সঙ্গে তার লেনদেন নিয়েও রয়েছে গুরুতর অভিযোগ। সচিবালয় ও মিরপুর ডিভিশনে দায়িত্বে থাকার সময় চুক্তিমূল্যের বড় অংশ নিজের পকেটে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। কেউ বিল নিতে গেলে তার প্রথম কথা ছিল—“কাজ শেষ, এখন টাকা দাও।” পাইকপাড়া ও শিয়ালবাড়ির বড় প্রকল্পগুলোতেও কাজ না হয়েও অগ্রিম বিল তুলে নেওয়া হয়েছিল—যার পেছনে তার সরাসরি সম্পৃক্ততা আছে বলে অভিযোগ।
বর্তমানে রেলওয়ে ডাইভারশন উপবিভাগের ২নং শাখায় থাকা অবস্থায়ও তিনি মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ডিএমপি ডেমরা পুলিশ লাইনসহ কয়েকটি বড় প্রকল্পে কর্তৃত্ব বিস্তার করেছেন। আরও দুইটি বড় প্রকল্প তার হাতে যাওয়ার অপেক্ষায়, এবং সূত্র বলছে—এই পোস্টিং টাকায় কেনা।
এমনকি ২০২৪ সালের ছাত্র জনতার আন্দোলন দমনে তিনি নেপথ্যে থেকে অনিয়মে জড়িত ছিলেন। রামপুরা, বনশ্রী ও খিলগাঁও এলাকায় ছাত্রলীগ ক্যাডারদের সহায়তায় তিনি প্রায় অর্ধকোটি টাকা ব্যয় করেছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
কিন্তু এখন সরকার বদলের সঙ্গে সঙ্গে তিনিই হঠাৎ বিরোধী সেজে ঘুরছেন। যেন নিজের অতীত ভুলে গেছে সবাই। অথচ পূর্ত অধিদপ্তরের সাধারণ প্রকৌশলীরা জানেন, মুখ হয়তো বদলেছে—কিন্তু স্বভাবের বিন্দুমাত্র পরিবর্তন হয়নি। তিনি এখনও সেই ক্ষমতালোভী, প্রভাবশালী, বিতর্কিত জুয়েলই রয়ে গেছেন। একজন উপসহকারী প্রকৌশলী হয়েও যেন পুরো অধিদপ্তরের অঘোষিত ‘রাজা’।
তার বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ জানতে ফোন করা হলে সাংবাদিক পরিচয় শুনেই তিনি ফোন কেটে দেন এবং আর কোনো জবাব দেননি।
