
বিশেষ প্রতিবেদকঃ বাংলাদেশের সরকারি দপ্তরে সেবা নিতে গেলে অনেকেই এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন। কেউ সরাসরি বলে দেন—“১০ কোটি টাকা দিয়ে এই চেয়ারে বসেছি, টাকা ছাড়া কাজ করানো যাবে না।” কথাটা শুনতে যতটা আগ্রাসী মনে হয়, বাস্তবে এর চিত্র আরও ভয়াবহ। দেশের বহু সরকারি দপ্তরে বদলি-বাণিজ্য যেন ওপেন সিক্রেট—যেখানে পদ, পোস্টিং আর দায়িত্ব সবই নির্ভর করে কে কত টাকা দিতে পারে তার ওপর।
অধিকাংশ মানুষের ধারণা, এসব অনৈতিক কাজ হয়তো নিচের স্তরের কয়েকজন কর্মচারীর মধ্যে সীমাবদ্ধ। কিন্তু অনুসন্ধানে দেখা যায় চিত্র একেবারেই উল্টো—সচিব পর্যায় থেকে শুরু করে নিম্নতম স্তর পর্যন্ত অনেক কর্মকর্তা পছন্দের পদে যেতে মোটা অঙ্কের টাকা লেনদেন করে থাকেন। যিনি লাখ টাকা বা কোটি টাকা দিয়ে কোনো পদে যান, তিনি প্রথম দিন থেকেই সেই বিনিয়োগ তুলতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। তারপর নিজের ভবিষ্যতের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে শুরু করেন আরও টাকা তোলার পথ খোঁজা—ফলে সাধারণ মানুষকে হয়রানি তো বাড়েই, সেই অফিসগুলোতে দুর্নীতি মোটেই কমে না।
বিবিএস পরিচালিত সিটিজেন পারসেপশন সার্ভে (সিপিএস)–এর ‘প্রাথমিক প্রতিবেদন ২০২৫’-এ উঠে এসেছে সরকারি সেবার করুণ অবস্থা। জানান হয়েছে—গত এক বছরে সরকারি সেবা নিতে গিয়ে ৩১.৬৭ শতাংশ নাগরিক ঘুষ দিয়েছেন। পুরুষদের ক্ষেত্রে এ হার ৩৮.৬২ শতাংশ, নারীদের ক্ষেত্রে ২২.৭১ শতাংশ। ঘুষ-দুর্নীতির দৌড়ে সবচেয়ে এগিয়ে আছে বিআরটিএ (৬৩.২৯ শতাংশ)। এরপর আইন প্রয়োগকারী সংস্থা (৬১.৯৪ শতাংশ), পাসপোর্ট অফিস (৫৭.৪৫ শতাংশ) এবং ভূমি রেজিস্ট্রি অফিস (৫৪.৯২ শতাংশ)।
টিআইবি পরিচালিত নবম থানা জরিপে পরিস্থিতি আরও মারাত্মকভাবে উঠে এসেছে। সেখানে বলা হয়েছে—দেশে ৭০.৯ শতাংশ খানা কোনো না কোনোভাবে দুর্নীতির শিকার। ১৭টি খাতের মধ্যে সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা। এরপর রয়েছে পাসপোর্ট ও বিআরটিএ। জরিপে অংশ নেওয়া ৭২.১ শতাংশ খানা জানিয়েছেন—ঘুষ না দিলে সেবা পাওয়া যায় না। গড়ে প্রতিটি পরিবার ৬,৬৩৬ টাকা করে ঘুষ দিয়েছে এবং এর মোট পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১০ হাজার ৮৩০ কোটি টাকার মতো—যা কেবলই সরকারি সেবা নিতে গিয়ে জনগণের পকেট থেকে বেরিয়ে গেছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীতেও বদলি-বাণিজ্য দীর্ঘদিনের পরিচিত বাস্তবতা। অতীতে গুলশান, বনানী, ধানমন্ডির মতো অভিজাত এলাকায় ওসি হতে ১০–১৫ কোটি টাকা পর্যন্ত লাগে বলে স্বীকার করেছেন সংশ্লিষ্টরা। এখনো পরিস্থিতির তেমন পরিবর্তন হয়নি। শুধু ওসি না, এসব থানায় কনস্টেবল হিসেবেও ঢাকায় পোস্টিং নিতে লাখ লাখ টাকা লেনদেন হয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পুলিশ সদস্য জানিয়েছেন—ঢাকার বাইরে থেকে ঢাকায় আসতে চাইলে পদভেদে লাখ থেকে কোটি টাকা পর্যন্ত লাগে। স্বাভাবিকভাবেই, ঘুষ দিয়ে পদ পাওয়া অফিসারদের কাছ থেকে সততা বা স্বচ্ছতা আশা করা কঠিন।
ভূমি অফিসের চিত্রও একই। সাব-রেজিস্ট্রাররা এই খাতের মূল ভাগ আদায়কারীর ভূমিকায় থাকেন। তারা সরাসরি জনগণের কাছ থেকে অর্থ আদায় করেন এবং সেই টাকা আবার নির্দিষ্ট নিয়মে উপরের দিকে পৌঁছে যায়। গুলশান, গাজীপুর, রূপগঞ্জ, কেরানীগঞ্জ—এ ধরনের জায়গার সাব-রেজিস্ট্রার পদ নাকি রীতিমতো নিলামে বিক্রি হয়, কয়েক কোটি টাকা পর্যন্ত দাম ওঠে।
বন বিভাগ, গণপূর্ত অধিদপ্তর, সড়ক ও জনপদ বিভাগ, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগ—এসব দপ্তরের অনেক উচ্চপদে বদলি হতে প্রচুর টাকা লাগে। এমনকি ২০২৩ সালে একটি প্রধান প্রকৌশলীর পদ শত কোটি টাকায় বিক্রি হয়েছিল বলে জানা যায়। ডাক্তারদের ক্ষেত্রেও ঢাকায় বদলি হয়ে কাজ করতে চাইলে লাখ টাকা পর্যন্ত দিতে হয়।
সবমিলিয়ে একটি বিষয় স্পষ্ট—যেখানে মোটা টাকা দিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা দায়িত্বে বসেন, সেখানে সেবা নয়, তাদের মূল লক্ষ্য থাকে কীভাবে বিনিয়োগ করা টাকা তুলবেন আর কতটা বাড়তি আয় করতে পারবেন। ফলে সাধারণ মানুষ পড়ে যায় এক দুষ্টচক্রে—যেখানে ঘুষ, ভোগান্তি আর দুর্নীতি ছাড়া কিছুই চোখে পড়ে না।
