
নিজস্ব প্রতিবেদকঃ ঢাকা ওয়াসার নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নিয়োগ নিয়ে আবারও শুরু হয়েছে বিতর্ক। সংস্থার বর্তমান অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আব্দুস সালাম ব্যাপারীকে এই পদে বসানোর জন্য নানাভাবে প্রক্রিয়া বদলে ফেলার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে— তাঁর যোগ্যতা নিশ্চিত করতে একাধিকবার নিয়োগের শর্ত পরিবর্তন করা হয়েছে, এমনকি তাঁকে দ্রুত পদোন্নতিও দেওয়া হয়েছে।
ওয়াসার সাম্প্রতিক বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্ট বলা ছিল, যোগ্য প্রার্থীদের সাক্ষাৎকার নেওয়া হবে। কিন্তু সেটি মানা হয়নি। ৩৭ জন আবেদনকারী থাকার পরও কাউকে ডাকা হয়নি। বরং সরাসরি তিনজনের তালিকা তৈরি করে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে, যেখানে প্রথমেই রাখা হয়েছে আব্দুস সালামের নাম। এরপর সেই তালিকাই প্রধান উপদেষ্টার দপ্তরে পাঠানো হয়েছে।
তবে মন্ত্রণালয় বা ওয়াসার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এ নিয়ে মুখ খুলছেন না। স্থানীয় সরকার বিভাগের অতিরিক্ত সচিব সুরাইয়া আখতার জাহান, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মীর আবদুস শহিদ এবং ওয়াসার সচিব মশিউর রহমান খানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
ওয়াসার ভেতরের অনেক কর্মকর্তা এই প্রক্রিয়াকে ‘পছন্দের লোক বসানোর খেলা’ বলছেন। তাঁদের অভিযোগ, আব্দুস সালামের বিরুদ্ধে অতীতে দুর্নীতির অভিযোগ ছিল, যার কারণে তাকসিম এ খানের সময়ে তাঁকে প্রায় চার বছর সংযুক্ত অবস্থায় (ওএসডি’র মতো) বসিয়ে রাখা হয়েছিল। পরে বিগত সরকারের পতনের পর তিনি নিজেকে ‘বঞ্চিত কর্মকর্তা’ দাবি করে প্রভাব খাটিয়ে নিজের বিরুদ্ধে থাকা বিভাগীয় মামলা প্রত্যাহার করান।
তবে আব্দুস সালাম নিজেকে সবচেয়ে যোগ্য দাবি করে বলেন, “ঢাকা ওয়াসার প্রকৌশল কাজে আমার মতো অভিজ্ঞ কেউ নেই। অন্য কেউ এ দায়িত্ব নিলে কাজ চালানোই কঠিন হবে।”
ঢাকা ওয়াসায় বর্তমানে প্রায় ৪৩ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প চলমান, যেখানে এমডি ও প্রকল্প পরিচালকের পদ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অভ্যন্তরীণ সূত্র বলছে, এসব পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে বড় অঙ্কের অর্থ লেনদেনের অভিযোগ নতুন নয়।
তাকসিম এ খানের দীর্ঘ ১৫ বছরের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর (২০০৯ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত) ওয়াসায় আর স্থায়ী এমডি নিয়োগ হয়নি। তিনি দুর্নীতি, অনিয়ম ও অর্থ অপচয়ের অভিযোগে বিতর্কিত হয়ে গত বছর সরকারের পতনের পর পদত্যাগ করেন। তাঁর পর থেকে তিনজন কর্মকর্তা অস্থায়ীভাবে দায়িত্ব পালন করেন, কিন্তু এখনো কেউ স্থায়ীভাবে নিয়োগ পাননি।
প্রথমে ২১ মার্চ এমডি পদে বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়, যেখানে বলা হয়েছিল ৬০ বছরের বেশি বয়স হলেও অভিজ্ঞ প্রার্থীরা আবেদন করতে পারবেন। তখন আব্দুস সালাম চতুর্থ গ্রেডের কর্মকর্তা হওয়ায় তিনি অযোগ্য ছিলেন। কিন্তু মাত্র দুই দিন পর ২৩ মার্চ নতুন বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে সেই শর্তই বদলে ফেলা হয়— এখন বয়স ৬০ বছরের বেশি হলে আবেদন করা যাবে না। এতে অনেক অভিজ্ঞ প্রার্থী বাদ পড়ে যান। এরপর তাঁকে দ্রুত পদোন্নতি দিয়ে তৃতীয় গ্রেডে তোলা হয়, যাতে পরের বিজ্ঞপ্তিতে তিনি যোগ্য হয়ে যান।
সর্বশেষ ১৫ জুলাই নতুন বিজ্ঞপ্তিতে তিনি আবেদন করেন, আর কোনো সাক্ষাৎকার ছাড়াই তিনজনের সংক্ষিপ্ত তালিকায় তাঁর নাম শীর্ষে উঠে আসে। দ্বিতীয় স্থানে ছিলেন সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মোস্তাফিজুর রহমান এবং তৃতীয় স্থানে এলজিইডির সাবেক অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী এনামুল হক।
বর্তমানে ওয়াসার পরিচালনা বোর্ড না থাকায় নিয়োগ প্রক্রিয়া পরিচালনা করছে তথাকথিত ‘কর্মসম্পাদন সহায়তা কমিটি’। এই কমিটির নেতৃত্বে রয়েছেন স্থানীয় সরকার বিভাগের অতিরিক্ত সচিব সুরাইয়া আখতার জাহান, আর সদস্যসচিব হিসেবে কাজ করছেন ওয়াসার সচিব মশিউর রহমান খান। কমিটিতে আরও আছেন জনপ্রশাসন, অর্থ, পানিসম্পদ ও স্বাস্থ্য বিভাগের প্রতিনিধি, এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ এবং ছাত্র প্রতিনিধি আহনাফ সাঈদ খান।
এই নিয়োগ প্রক্রিয়ার বৈধতা নিয়ে ইতিমধ্যে আদালতে রিট হয়েছে। মো. লিয়াকত আলী নামের একজন আবেদনকারী হাইকোর্টে রিট করলে, আদালত ৩ নভেম্বর নিয়োগ প্রক্রিয়া স্থগিত করে রুল জারি করেন।
নগর–পরিকল্পনাবিদ ও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্লানার্সের সভাপতি অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান বলেছেন, “পছন্দের মানুষ বসানোর প্রতিযোগিতা যদি সরকারি সংস্থাগুলোর সংস্কৃতিতে পরিণত হয়, তাহলে প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হবে। এটি সৎ কর্মকর্তাদের নিরুৎসাহিত করে এবং জনগণের সেবাকে প্রভাবিত করে।”
তিনি আরও বলেন, “সরকারের উচিত স্বচ্ছ নিয়োগনীতি তৈরি করা এবং যাঁরা এই কৌশলগত নিয়োগের পেছনে রয়েছেন, তাঁদের জবাবদিহির আওতায় আনা।”
