
বিশেষ প্রতিবেদকঃ নারায়ণগঞ্জ গণপূর্ত বিভাগে নির্বাহী প্রকৌশলী হারুন অর রশিদকে ঘিরে সাম্প্রতিক সময়ে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়েছে। একদিকে তার বিরুদ্ধে টেন্ডার বাণিজ্য, ক্ষমতার অপব্যবহার ও রাজনৈতিক প্রভাব খাটানোর অভিযোগ উঠেছে, অন্যদিকে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর গণমাধ্যমে তাকে সম্পূর্ণ নির্দোষ দেখানোর চেষ্টা চলছে। এই দ্বন্দ্বে সাধারণ ঠিকাদার, কর্মকর্তা ও সচেতন মহলে প্রশ্ন উঠেছে—আসল সত্য কোনটা?
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, হারুন অর রশিদ অতীতে বুয়েট ছাত্রলীগের একজন সক্রিয় ও প্রভাবশালী নেতা ছিলেন। ক্যাম্পাস রাজনীতিতে তার ভূমিকা নিয়ে তখনও বিতর্ক ছিল বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি। অভিযোগ রয়েছে, জুলাই–আগস্টের ছাত্র–জনতার আন্দোলনের সময় তিনি আন্দোলনকারীদের বিপক্ষে অবস্থান নেন। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর হঠাৎ নিজেকে ‘বৈষম্যের শিকার কর্মকর্তা’ হিসেবে উপস্থাপন করে নারায়ণগঞ্জের মতো গুরুত্বপূর্ণ গণপূর্ত বিভাগে তার পদায়ন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে থাকা তার পুরোনো রাজনৈতিক ছবি ও পোস্টগুলো সেই নিরপেক্ষতার দাবিকে দুর্বল করে বলে মনে করছেন অনেকে।
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ এসেছে টেন্ডার ব্যবস্থাপনা ঘিরে। বলা হচ্ছে, হারুন অর রশিদ গণপূর্তের আলোচিত কর্মকর্তা ও বর্তমানে ওএসডি থাকা আতিকুল ইসলামের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত। এই সম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে একটি নির্দিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, আতিকুল ইসলামের স্ত্রীর মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান ‘অ্যাডরয়েড কনসাল্ট্যান্টস অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারস’-কে টেন্ডার পাইয়ে দিতে পিপিআর বিধি উপেক্ষা করা হয়। টেন্ডার সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আগেই নির্দিষ্ট পক্ষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার কথাও শোনা যাচ্ছে।
বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে ১০ মার্চ ২০২৫ তারিখটি। অভিযোগ রয়েছে, ওই একদিনেই ছয়টি বড় প্রকল্পের টেন্ডার আহ্বান করা হয় এবং অবাক করার মতোভাবে ছয়টির ছয়টিই পায় একই পারিবারিক প্রতিষ্ঠান। কাগজে-কলমে প্রতিযোগিতা থাকলেও বাস্তবে অন্য ঠিকাদারদের অংশগ্রহণ ছিল নামমাত্র। এই প্রক্রিয়ায় প্রায় ১০ কোটি ৬৬ লাখ টাকার সরকারি কাজ একচেটিয়াভাবে বণ্টন হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
নারায়ণগঞ্জের আগেও হারুন অর রশিদের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ শোনা গেছে। রাজশাহী গণপূর্তে কর্মরত থাকাকালে টেন্ডার ছাড়াই সরকারি ভবনের কাজ শুরু করার অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। তখন বিষয়টি প্রকাশ্যে এলেও তিনি বড় ধরনের কোনো শাস্তির মুখে পড়েননি। সংশ্লিষ্টদের দাবি, তৎকালীন প্রধান প্রকৌশলী শামীম আখতারের ঘনিষ্ঠতা ও আশ্রয়েই তিনি সেই সময় রক্ষা পান। আরও অভিযোগ আছে, শামীম আখতার নিজের দুর্নীতির বলয় ধরে রাখতে রাজনৈতিকভাবে বিতর্কিত কর্মকর্তাদের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় পুনর্বাসন করেছিলেন, হারুন অর রশিদ তার একটি উদাহরণ।
এই সব অভিযোগ প্রকাশের পর হঠাৎ করে একটি গৃহপালিত গণমাধ্যমে হারুন অর রশিদের পক্ষে পাল্টা প্রতিবেদন প্রকাশ পায়। সেখানে তাকে সৎ, নির্যাতিত এবং ষড়যন্ত্রের শিকার কর্মকর্তা হিসেবে তুলে ধরা হয়। সব অভিযোগকে ‘মিথ্যা ও ভিত্তিহীন’ বলে উড়িয়ে দেওয়া হলেও একই দিনে একাধিক টেন্ডার, একই প্রতিষ্ঠান ও একই সিন্ডিকেট—এই প্রশ্নগুলোর কোনো স্পষ্ট জবাব সেখানে নেই। বরং অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে অসাধুতা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত কাজের অভিযোগ তোলা হয়।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, অভিযোগ সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদকদের বিরুদ্ধে মামলা ও হুমকির কথা শোনা যাচ্ছে। বলা হচ্ছে, হারুন অর রশিদ ও তার সহযোগীরা সম্পাদক, প্রকাশক ও সাংবাদিকদের ভয় দেখাতে আইনি পদক্ষেপের কথা বলছেন। এমনকি গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের আইন কর্মকর্তা এবং বর্তমান প্রধান প্রকৌশলী খালেকুজ্জামান চৌধুরীর নাম ব্যবহার করে মামলা অনুমোদনের গল্পও ছড়ানো হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
এই পরিস্থিতিতে নারায়ণগঞ্জের সাধারণ ঠিকাদারদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। তাদের প্রশ্ন, যদি নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ ঘরানার নেতারা এখনও টেন্ডার ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করেন, তাহলে ছাত্র–জনতার আন্দোলনের ত্যাগের মানে কী? গণপূর্ত অধিদপ্তরের ভেতরেও অনেক কর্মকর্তা মনে করছেন, দুর্নীতির এই বলয় ভাঙা না গেলে প্রতিষ্ঠানটির ভাবমূর্তি ফেরানো সম্ভব নয়।
সব মিলিয়ে এখন মূল প্রশ্ন একটাই—হারুন অর রশিদের বিরুদ্ধে ওঠা গুরুতর অভিযোগগুলোর সত্যতা কি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তে যাচাই হবে, নাকি প্রভাব, ভয় আর প্রপাগান্ডার আড়ালে সত্য চাপা পড়ে যাবে? অন্তর্বর্তী সরকারের সামনে এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার দায় এড়ানোর সুযোগ নেই।
