
নিজস্ব প্রতিবেদকঃ দেশের প্রধান বিমানঘাঁটি হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এখন লাগেজ গায়েব ও পণ্য চোর সিন্ডিকেটের কবলে। প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও হারিয়ে যাচ্ছে যাত্রীদের লাগেজ কিংবা রপ্তানি কার্গোর মূল্যবান পণ্য। বহু ফরওয়ার্ডিং কোম্পানি বারবার লিখিত অভিযোগ করেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা পাচ্ছে না। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ব্যবসায়ীরা, আর ধীরে ধীরে দেশের রপ্তানি বাণিজ্যের আস্থাও হারাচ্ছে বিদেশি ক্রেতাদের কাছে।
বিমানবন্দর সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, কার্গো ভিলেজে দামি ব্র্যান্ডের পণ্য চুরির পেছনে বেশ কয়েকটি সংঘবদ্ধ চক্র সক্রিয়। তারা আগে থেকেই জেনে নেয় কোন কোম্পানি কী ধরনের পণ্য রপ্তানি করছে। সেই তথ্য পেয়ে টার্গেট করে পরিকল্পিতভাবে চুরি করে নেয় পণ্য। সিসিটিভি ক্যামেরার সীমিত কভারেজ, নষ্ট ক্যামেরা আর মনিটরিংয়ের ঘাটতির সুযোগে এই চক্র নির্ভয়ে কাজ করছে।
অভ্যন্তরীণ তদন্তে দেখা গেছে, চুরি করা মালামাল বেশিরভাগ সময় ওয়্যারহাউজের ময়লার স্তূপে লুকিয়ে রাখা হয়। পরে ময়লার গাড়িতে করে বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়। আবার কেউ কেউ শৌচাগারে গিয়ে পোশাক বদলে পণ্য শরীরে লুকিয়ে বাইরে চলে আসে। কখনো স্ক্যানিংয়ের সময়, কখনো লোডিংয়ের সময়, আবার অনেক সময় ওয়্যারহাউজের বাইরে রেখেও চুরি হয় পণ্য।
চুরি শুধু কার্গো ভিলেজেই নয়—টার্মিনালের ক্যানোপি এলাকাতেও ঘটছে। স্বজনদের জন্য অপেক্ষার জায়গা থেকে অনেক সময় ব্যাগ বা পণ্য উধাও হয়ে যাচ্ছে। ৫ নভেম্বর এমনই এক ঘটনায় ইয়াংওয়ান করপোরেশনের শিপমেন্ট থেকে নয়টি পোশাক চুরি হয়। ফরওয়ার্ডার কোম্পানির উদ্যোগে বাফার সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, চোরাই পণ্য নিয়ে যাওয়ার সময় চোর সোজা প্রধান গেট দিয়ে বেরিয়ে গেছে।
পরবর্তীতে অনুসন্ধানে জানা যায়, ওই ব্যক্তি বিমান নিরাপত্তা অফিসে খাদ্য সরবরাহকারী হিসেবে কাজ করেন, তবে তিনি কোনো স্থায়ী কর্মচারী নন এবং কার্গো ভিলেজে প্রবেশের অনুমতিও ছিল না। অথচ দীর্ঘদিন ধরে সেখানেই কাজ করছিলেন। বাফার সুপারভাইজারের সহযোগিতায় চুরি যাওয়া নয়টির মধ্যে ছয়টি পণ্য ফেরত আনা সম্ভব হয়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কার্গো ভিলেজের অনেক সিসিটিভি ক্যামেরা অকেজো বা ভাঙা অবস্থায় আছে। কিছু ক্যামেরা স্থির অবস্থায় ঘুরছে না, ফলে পুরো জায়গা কভার হচ্ছে না। এমনকি ছাদে ক্যামেরা না থাকায় কার্গোর স্তূপের আড়ালের দৃশ্য অদৃশ্যই থেকে যাচ্ছে। এই সুযোগে চোরচক্র নির্বিঘ্নে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
তদন্তে আরও উঠে এসেছে, বাফা (Bangladesh Freight Forwarders Association)–এর কিছু সদস্য ছাড়াও বিমানের নিজস্ব লোডাররাও এই সিন্ডিকেটের সঙ্গে যুক্ত। তাদের অনেকে চোরচক্রের সঙ্গে যোগাযোগ রাখে বলে ধারণা করছে সংশ্লিষ্টরা। এমনকি বিমান কর্তৃপক্ষ, সিভিল এভিয়েশন ও সিকিউরিটি কর্মকর্তাদের কাছেও এসব তথ্য আছে, কিন্তু দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেই।
টাওয়ার ফ্রেইট লজিস্টিক লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ১৪ অক্টোবর, ৬ নভেম্বর এবং এর আগেও একাধিকবার লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন রপ্তানি কার্গো ভিলেজের মহাব্যবস্থাপকের কাছে। গত বছরের মার্চ মাসেও তারা একই ধরনের অভিযোগ করেছিলেন। কিন্তু এক বছর পেরিয়েও কার্যকর কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। ফলে ব্যবসায়ীরা একদিকে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন, অন্যদিকে বিদেশি ক্রেতাদের আস্থা হারিয়ে রপ্তানি আদেশ প্রতিযোগী দেশগুলোতে চলে যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা ঘাঁটি বিমানবন্দর যদি চোরচক্রের কবলে চলে যায়, তাহলে এটি শুধু আর্থিক ক্ষতির কারণ নয়, জাতীয় নিরাপত্তা ও দেশের ভাবমূর্তির জন্যও বড় হুমকি। তারা বলছেন, দ্রুত ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ না নিলে এর প্রভাব রপ্তানি খাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং বিমানবন্দরের সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর আস্থা হারাবে আন্তর্জাতিক মহল।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের কার্গো বিভাগের জেনারেল ম্যানেজার এ বি বি নোজমুল হুদা জানান, জনসংযোগ বিভাগে যোগাযোগ করতে। কিন্তু জনসংযোগ বিভাগের মহাব্যবস্থাপক বোসরা ইসলাম ফোন রিসিভ করেননি। একইভাবে বাফার ইনচার্জ আবু বকর সিদ্দিক সাংবাদিক পরিচয় জানার পর ফোন কেটে দেন।
উল্লেখ্য, গত ১৮ অক্টোবর কার্গো ভিলেজে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর সিলগালা করা স্ট্রংরুমে রাখা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অস্ত্রভাণ্ডারের তালা ভেঙে যাওয়ার ঘটনা ঘটে। পরে ২৭ অক্টোবর জিডি করা হলেও ৪ নভেম্বর বিষয়টি প্রকাশ পায়। ধারণা করা হচ্ছে, সেখান থেকেও কিছু অস্ত্র চুরি গেছে। ওই ঘটনার পর ৫ নভেম্বর আবারও দায়িত্বে থাকা আনসার সদস্য জেনারুল ভস্মীভূত দ্রব্যের মধ্যে লুকানো ১৫টি বাটন ফোন চুরির চেষ্টা করলে পরদিন তাকে আটক করা হয়।
.
Copyright © 2025 All rights reserved Dhaka News