
বিশেষ প্রতিবেদকঃ রাষ্ট্রায়ত্ত পরিবহন সংস্থা বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্পোরেশন (বিআরটিসি)-এ বদলি-বাণিজ্য, প্রভাব বিস্তার, সুবিধাজনক পদায়ন এবং ঠিকাদারকে ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগকে ঘিরে নতুন করে আলোচনায় এসেছেন কর্মকর্তা মো. জামিল হোসেন। গত এক বছরের ব্যবধানে তার দুটি গুরুত্বপূর্ণ বদলিকে কেন্দ্র করে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ, রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ এবং একটি ঠিকাদার নির্যাতন মামলার তথ্য সামনে আসায় বিআরটিসির অভ্যন্তরে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য, সরকারি তদন্ত বা আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো প্রকাশিত হয়নি। ফলে অভিযোগগুলোর স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এক বছরে দুই বদলি, দুই দফা লেনদেনের অভিযোগ : বিআরটিসির একাধিক সূত্রের দাবি, প্রায় এক বছর আগে জামিল হোসেন বরিশাল বাস ডিপো থেকে টুঙ্গিপাড়া বাস ডিপোতে বদলি হন। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো অভিযোগ করেছে, ওই বদলিকে কেন্দ্র করে প্রায় ১০ লাখ টাকা লেনদেন হয়েছিল।
এর এক বছরের মাথায় ২০২৬ সালের জুনে তিনি টুঙ্গিপাড়া বাস ডিপো ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে চট্টগ্রাম ট্রাক ডিপো ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে ইউনিট প্রধান হিসেবে বদলি হন। ১৭ জুন ২০২৬ তারিখে জারি হওয়া বিআরটিসির একটি প্রশাসনিক আদেশে এ বদলির তথ্য উল্লেখ রয়েছে। এ বদলিকে ঘিরেও প্রায় ২০ লাখ টাকা লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে বলে একাধিক সূত্র দাবি করেছে। যদিও এ অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাইযোগ্য কোনো সরকারি নথি বা তদন্ত প্রতিবেদন এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে আসেনি।
‘প্রাইজ পোস্টিং’-এর অভিযোগ : বিআরটিসির অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলো বলছে, চট্টগ্রাম ট্রাক ডিপো দীর্ঘদিন ধরেই সংস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী কর্মস্থল হিসেবে বিবেচিত। এ ধরনের পদায়নকে ঘিরে অতীতে নানা সময়ে ‘প্রাইজ পোস্টিং’ বা কাঙ্ক্ষিত পদায়নের অভিযোগ উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, জামিল হোসেন ধারাবাহিকভাবে সুবিধাজনক কর্মস্থল পেয়ে আসছেন এবং প্রতিটি পদায়নের পেছনে প্রভাব ও আর্থিক লেনদেনের বিষয়টি আলোচনায় রয়েছে।
সাবেক রাজনৈতিক বলয়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ : বিআরটিসির একাধিক কর্মকর্তা দাবি করেছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় জামিল হোসেন সাবেক চেয়ারম্যান তাজুল ইসলামের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিলেন এবং সেই প্রভাব কাজে লাগিয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদায়ন ও প্রশাসনিক সুবিধা পেয়েছেন। অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলো আরও অভিযোগ করেছে, সরকার পরিবর্তনের পরও তিনি নতুন প্রশাসনিক বলয়ের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করে নিজের অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছেন। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে জামিল হোসেনের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ঠিকাদারকে অপহরণ ও নির্যাতনের অভিযোগ : জামিল হোসেনের বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি এসেছে ঠিকাদার মোহাম্মদ আবুল হাসানের কাছ থেকে। অভিযোগ অনুযায়ী, গাবতলী ডিপোতে দায়িত্ব পালনকালে জামিল হোসেনসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে তাকে জোরপূর্বক তুলে নেওয়া, মারধর, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং অচেতন অবস্থায় ফেলে রাখার অভিযোগ রয়েছে। এ ঘটনায় জামিল হোসেনসহ ১৮ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। তবে মামলাটির বর্তমান অবস্থা, তদন্ত অগ্রগতি বা আদালতের পর্যবেক্ষণ সম্পর্কে আনুষ্ঠানিক তথ্য পাওয়া যায়নি।
চেয়ারম্যানকে ঘিরেও অভিযোগ : বিআরটিসির বর্তমান : চেয়ারম্যান অতিরিক্ত সচিব আব্দুল লতিফ মোল্লাকে ঘিরেও বদলি-বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। বিভিন্ন সূত্রের দাবি, একাধিক বাস ও ট্রাক ডিপোতে কর্মকর্তাদের পদায়নের ক্ষেত্রে মোটা অঙ্কের অর্থ লেনদেন এবং মাসিক আর্থিক সুবিধার অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে এখন পর্যন্ত কোনো সরকারি তদন্ত প্রতিবেদন বা বিচারিক সিদ্ধান্ত প্রকাশ হয়নি। চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে তার আনুষ্ঠানিক অবস্থানও স্পষ্টভাবে জানা যায়নি।
বিআরটিসির ভেতরে অস্বস্তি : বিআরটিসির কয়েকজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, প্রতিষ্ঠানটির ভেতরে এখনও বিভিন্ন সময়ের প্রভাবশালী বলয়ের সদস্যরা সক্রিয় রয়েছেন। তাদের দাবি, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, বদলি এবং পদায়নকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে একটি অস্বচ্ছ সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। তাদের মতে, গুরুত্বপূর্ণ পদায়নগুলোতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত না হলে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম, রাজস্ব ব্যবস্থাপনা এবং সেবার মান আরও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
সরকারি নথিতে নতুন পদায়ন : ১৭ জুন ২০২৬ তারিখে জারি হওয়া বিআরটিসির আদেশ অনুযায়ী মো. জামিল হোসেনকে টুঙ্গিপাড়া বাস ডিপো ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে চট্টগ্রাম ট্রাক ডিপো ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে ইউনিট প্রধান হিসেবে পদায়ন করা হয়েছে। আদেশে ২৫ জুনের মধ্যে দায়িত্ব হস্তান্তর ও নতুন কর্মস্থলে যোগদানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তদন্তের দাবি : এক বছরের ব্যবধানে একাধিক পদায়ন, আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ, রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ এবং ঠিকাদার নির্যাতনের মামলাকে কেন্দ্র করে মো. জামিল হোসেনকে ঘিরে বিআরটিসিতে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
সুশাসন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্টদের দাবি, অভিযোগগুলো নিয়ে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে বদলি ও পদায়ন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সরকারি নজরদারি জোরদারের আহ্বান জানিয়েছেন বিআরটিসির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
অনুসন্ধান চলমান : অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা পরবর্তী প্রতিবেদনে প্রকাশ করা হবে।)
